বর্তমানে ভারতবর্ষের সব চেয়ে বড় স্বাস্থ্য প্রকল্পের নাম আয়ুষ্মান ভারত, কিভাবে পাবেন বার্ষিক ৫ লক্ষ টাকার চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তার বিস্তারিত আলোচনা। এর পুরো নাম প্রধান মন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা – PMJAY, সহজ ভাষার এই প্রকল্পকে ‘মোদী কেয়ার’ বা ‘আয়ুষ্মান কার্ড ও বলা হয়ে থাকে। এই আয়ুষ্মান কার্ডটি আপনার পুরো পরিবারকে বার্ষিক ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সম্পূর্ণ ফ্রি চিকিৎসা দেওয়ার গ্যারান্টি দেয়। ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার আসার পর এই প্রকল্পটি চালু হয়। জানা যাচ্ছে যে মোট ১ কোটি ১০ লক্ষ পরিবার এর আওতায় আসবেন।

Table of Contents
আয়ুষ্মান ভারত যোজনা আসলে কি ?
আয়ুষ্মান ভারত যোজনা হল সারা বিশ্বের সব চেয়ে বড় স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্প গুলির মধ্যে একটি। ২০১৮ সালের ২৩ সে সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী ঝাড়খন্ড রাজ্য থেকে সবার প্রথমে এটি চালু করেন।
আয়ুষ্মান ভারত যোজনার উদ্দেশ্য কি ?
আয়ুষ্মান ভারত যোজনার মূল উদ্দেশ্য হলো দুটি –
দ্বিতীয় স্তর ও তৃতীয় স্তরের চিকিৎসা : দ্বিতীয় স্তর ও তৃতীয় স্তরের চিকিৎসা এর মানে হলো বড়ো ধরনের কোনো অপারেশন, ক্যান্সার, হার্টের অসুখ, কিডনি বা ডায়ালিসের মতো চিকিৎসা গরিব মানুষ যাতে বিনা পয়সায় করতে পারে।
আর্থিক সুরক্ষা : চিকিৎসা করতে গিয়ে হাসপাতালের খরচের জন্য যাতে কোনো পরিবারকে ধার করতে বা জমি-বাড়ি বিক্রি করতে না হয় তার জন্য এই প্রকল্পটি চালু করছে ভারত সরকার। এই প্রকল্পটির মধ্যে আবার ‘ফ্যামিলি ফ্লাটের’ সুবিধা আছে অর্থাৎ ৫ লক্ষ টাকার চিকিৎসা শুধুমাত্র ১ জনের জন্য নয়। পরিবারে যদি ৫ থেকে ৬ জন মেম্বার থেকে থাকে তাহলে সবাই মিলে বৎসরে চিকিৎসা করতে পারবেন। অর্থাৎ সবাই মিলে এর সুবিধা পাবেন।
কারা কারা আয়ুষ্মান কার্ডের সুবিধা পাবে ? যোগ্যতা এবং বেনিফিশিয়ারি লিস্ট :
আয়ুষ্মান কার্ড সবার জন্য নয়। যাদের BPL রেশন কার্ড আছে যেমন – AAY (Antyodaya Anna Yojana) PHH (Priority Households) এবং SPHH (State Priority Households) আছে, তারাই আপাতত আয়ুষ্মান যোজনার আওতায় আসবে।পরবর্তী কালে সরকার যদি মনে করে তাহলে কিছু ক্যাটেগরির লোক জন দিতে পারে। কিন্তু তাও আবার নিচের ক্যাটেগরি গুলির মধ্যে থাকতে হবে। যেমন –
- যাদের ঘরে ১৬-৫৯ বছরের মধ্যে কোনো পুরুষ ও মেম্বার নেই।
- যাদের ঘরে ১৬-৫৯ বছরের মধ্যে কোনো মহিলা মেম্বার নেই।
- যাদের ঘরে ১৬-৫৯ বছরের মধ্যে কোনো পুরুষ ও মহিলা মেম্বার এর মধ্যে উভয়েই সক্ষম নয়।
- ঘরে প্রতিবন্ধী মানুষ আছে কিন্তু সাহার্য্য করার মতো কেউ নেই।
- SC/ST বা OBC পরিবার।
- ভূমিহীন পরিবার যারা দিনমজুরি করে খায়। এছাড়াও যাদের কাঁচা বাড়ি, নিরক্ষর প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ আছে তারাও এই প্রকল্পের জন্য অগ্রাধিকার পাবে।
তাছাড়া রাস্তার ঝাড়ুদার, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহপরিচারিকা, দোকানের কর্মচারী, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, রিক্সা চালক ইত্যাদি পেশার লোকেরা এই প্রকল্পের আওতায় থাকবেন। কিন্তু সরকারি কর্মচারী, আয়কর দাতা এবং যাদের ৪ চাকার গাড়ি আছে তারা এই প্রকল্পের আওতায় পড়বেন না।
পশ্চিমবঙ্গে আয়ুষ্মান ভারত – ২০২৬ এর নতুন আপডেট কি ?
২০১৮ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পটি চালু করতে দেননি বিগত তৃণমূল সরকার। তারা ‘স্বাস্থ্যসাথী’ নামে একটি প্রকল্প চালাচ্ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে সরকার চেঞ্জ হওয়ার পর কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মিলিত হওয়ার ফলে পশ্চিমবঙ্গে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পটির কাজ জোরকদমে চলছে।
স্বাস্থ্যসাথী কার্ড ও আয়ুষ্মান কার্ডের মধ্যে পার্থক্য কি ?
| স্বাস্থ্যসাথী | আয়ুষ্মান |
| পশ্চিমবঙ্গের কিছু সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিৎকিসা হয় | সারা ভারতবর্ষের সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিৎকিসা হয় |
| বছরে মোট টাকার পরিমান ৫ লক্ষ টাকা | বছরে মোট টাকার পরিমান ৫ লক্ষ টাকা |
| সরকারি অনুমোদনে বেশি সময় লাগে। | সরকারি অনুমোদনে অনেক কম সময় লাগে। |
| এটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রকল্প | এটি ভারত সরকারের প্রকল্প |
৫ লক্ষ টাকায় কি কি সুবিধা পাবেন ?
হাসপাতালে ভর্তি : ভর্তি হওয়ার ৩ দিন আগে এবং ছুটির ১৫ দিন পর পর্যন্ত OPD চিকিসার খরচ ফ্রি।
অপারেশন : হার্ট, ক্যান্সার, কিডনি, ব্রেন, হাড় ইত্যাদি অপারেশন ফ্রীতে করা হয়।
ওষুধ ও টেস্ট : ভর্তির সময় সমস্ত ওষুধ, এক্সরে, সিটি স্ক্যান, MRI পুরো বিনামূল্যে হয়।
ডক্টর ফী : সার্জেন ও নার্সিং সমস্ত ফ্রি।
খাবার : রোগী হাসপাতালে থাকাকালীন খাবার ফ্রি।
৫ লক্ষ টাকায় কি কি সুবিধা পাবেন না ?
আপনি শুধুমাত্র প্রসাধনী সার্জারি এবং দাঁতের চিকিৎসার সুবিধা পাবেন না।
আয়ুষ্মান কার্ডে আপনার নাম আছে কি না কিভাবে চেক করবেন ?
আপনি বাড়িতে বসেই মোবাইলে চেক করতে পারবেন আপনার নাম আছে কিনা। সবার প্রথমে ভারত সরকারের ন্যাশনাল হেলথ অথরিটি ওয়েবসাইট টি ওপেন করুন – https://beneficiary.nha.gov.in
- লগইন অপশনে আপনার মোবাইল নম্বর এবং ক্যাপচা কোড দিন l
- ভেরিফাই অপশনে ক্লিক করুন। আপনার মোবাইলে OTP আসবে, OTP বসিয়ে দিয়ে লগইন অপশনে ক্লিক করুন।
- সিলেক্ট করুন – PMJAY, তারপর স্টেট, ডিস্ট্রিক্ট, এবং শেষে রেশন কার্ড, আঁধার কার্ড বা PMJAY কার্ড নম্বর নম্বর সিলেক্ট করুন।
- যদি আঁধার কার্ড সিলেক্ট করে থাকেন, তাহলে আঁধার নম্বর বসিয়ে দিয়ে ক্যাপচা কোডটি বসিয়ে দিন।
- দেখবেন ফ্যামিলিতে যত জনের আয়ুষ্মান কার্ডে নাম আছে, সবার নাম দেখাবে।
বাড়িতে বসে মোবাইলের মাধ্যমে E-KYC কিভাবে করবেন ?
বাড়িতে বসে মোবাইল E-KYC করতে চাইলে নিচের স্টেপ গুলি ফলো করুন।
- সবার প্রথমে ভারত সরকারের ন্যাশনাল হেলথ অথরিটি ওয়েবসাইট টি ওপেন করুন – https://beneficiary.nha.gov.in
- লগইন অপশনে আপনার মোবাইল নম্বর এবং ক্যাপচা কোড দিন l
- ভেরিফাই অপশনে ক্লিক করুন। আপনার মোবাইলে OTP আসবে, OTP বসিয়ে দিয়ে লগইন অপশনে ক্লিক করুন।
- সিলেক্ট করুন – PMJAY, তারপর স্টেট, ডিস্ট্রিক্ট, এবং শেষে রেশন কার্ড, আঁধার কার্ড বা PMJAY কার্ড নম্বর নম্বর সিলেক্ট করুন।
- যদি আঁধার কার্ড সিলেক্ট করে থাকেন, তাহলে আঁধার নম্বর বসিয়ে দিয়ে ক্যাপচা কোডটি বসিয়ে দিন।
- দেখবেন ফ্যামিলিতে যত জনের আয়ুষ্মান কার্ডে নাম আছে, সবার নাম দেখাবে।
- E-KYC অপসন এ ক্লিক করুন।
- এর পর ভেরিফাই অপসন এ ক্লিক করুন। টার্ম এন্ড কন্ডিশন অপশনে ক্লিক করুন। মোবাইলে আঁধার কার্ডের OTP এবং মোবাইল OTP আসবে। দু জায়জায় দুটি OPT বসিয়ে দিন। শেষে অথেন্টিকেট অপশনে ক্লিক করুন।
- A
- B
আয়ুষ্মান কার্ড ডাউনলোড কিভাবে করবেন ?
E-KYC হয়ে গেলে ২ ভাবে আয়ুষ্মান কার্ড পাবেন।
- E-CARD : উপরের পদ্ধতি অনুসারে লগইন করে নিন l ডাউনলোড আয়ুষ্মান কার্ড এ ক্লিক করুন। আঁধার OTP বসিয়ে দিন। আপনার নামের পাশে পিডিএফ ডাউনলোড অপশন পাবেন। ডাউনলোড করুন এবং কালার প্রিন্ট করে লেমিনেশন করে নিন।
- ফিজিক্যাল কার্ড : আয়ুষ্মান কার্ড E-KYC করার পর নিকটবর্তী CSC সেন্টার, সরকারি হাসপাতাল বা “আয়ুষ্মান মিত্র” সেন্টারে গেলে তারা আপনাকে পিভিসি কার্ড বানিয়ে দিবে।
আয়ুষ্মান কার্ড দিয়ে হাসপাতালে কিভাবে চিকিৎসা করবেন ?
- হাসপাতাল : সবার প্রথমে আপনার হাসপাতাল চিহ্নিত করুন। ভারত সরকারের https://hem.nha.gov.in website এ গিয়ে আপনার কাছের হাসপাতালটি খুঁজে বের করুন।
- আয়ুষ্মান মিত্র : হাসপাতালে গিয়ে আয়ুষ্মান মিত্র কাউন্টার খুঁজুন। সেখানে আয়ুষ্মান কার্ড এবং আঁধার কার্ড জমা দিন।
- অনুমোদন : তারা আপনার কার্ড সোয়াইপ করে চিকিৎসার জন্য সরকারের কাছে অনুমোদন চাইবে। কিছুক্ষন পর অনুমোদন আসলে আপনার চিকিৎসা শুরু করবে। তারপর আর কোনো কোনো বিল দিতে হবে না। হাসপাতাল থেকে ছুটির দিনেও কোনো টাকা দিতে হবে না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা :
স্বাস্থ্যসাথী কার্ড আছে, আয়ুষ্মান কার্ড লাগবে কি ?
হ্যাঁ। স্বাস্থ্যসাথী কার্ড এবং আয়ুষ্মান কার্ড দুটি আলাদা আলাদা। এখন আর স্বাস্থ্যসাথী কার্ড দিয়ে চিকিৎসা করতে পারবেন না, কেননা পশ্চিমবঙ্গে এখন আয়ুষ্মান কার্ড চালু হয়ে গেছে।
আয়ুষ্মান কার্ড দিয়ে কি সারা ভারতে চিকিৎসা করা যায় ?
হ্যাঁ। আয়ুষ্মান কার্ড দিয়ে সারা ভারতের সমস্ত হাসপাতালে চিকিৎসা করা যায়।
নাম লিস্টে নেই, নতুন করে আবেদন করা যাবে কি ?
হ্যাঁ। এখন পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে আবেদন চলছে। আপনার যদি আয়ুষ্মান কার্ড না থাকে, তাহলে আপনি নতুন করে আবেদন করতে পারেন।
আয়ুষ্মান কার্ড হারিয়ে গেলে কি করবো ?
যদি আয়ুষ্মান কার্ড হারিয়ে যায় তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। ওয়েবসাইট থেকে আবার ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।
বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করতে কি টাকা লাগে ?
না। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করতে কোনো টাকা লাগে না। যদি কেউ টাকা চায় তাহলে ১৪৫৫৫ নম্বর এ অভিযোগ জানাতে পারবেন।
E-KYC না করলে কি হবে ?
আপনি যদি E-KYC না করেন তাহলে কার্ড পাবেন না এবং হাসপাতালেও চিকিৎসা করতে পারবেন না। তাই নাম থাকলেও তাড়াতাড়ি E-KYC করে নিন।
কার্ড জালিয়াতি থেকে বাঁচার উপায় কি ?
কার্ড জালিয়াতি থেকে বাঁচার ৩ টি উপায় হলো ১. E-KYC করার নামে কেউ টাকা চাইলে দেবেন না। ২. E-KYC করার সময় আসা OTP কাউকে ফোনে বলবেন না বা দেবেন না। ৩. শুধু অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ছাড়া অন্য কোনো লিঙ্কে ক্লিক করবেন না।
আয়ুষ্মান কার্ড কিভাবে আপনার জীবন বদলে দিতে পারে ?
বর্তমানে সারা ভারতবর্ষে ৬০ % মানুষ অসুখের কারণে গরিব হয়ে যায়। কারণ পরিবারের কারো অসুখ হলে হাসপাতালের বিল মেটাতে গিয়ে সারা জীবনের সঞ্চয় শেষ করে ফেলে। আয়ুষ্মান কার্ড সেই ভয় দূর করে দিবে। কারণ আপনার কাছে আয়ুষ্মান কার্ড থাকা মানে আপনার পরিবারে বৎসরে ৫ লক্ষ টাকার “স্বাস্থ্য বিমা” থাকা। ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে আয়ুষ্মান প্রকল্প চালু হওয়ার ফলে রাজ্যের প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ পরিবার এই প্রকল্পের সুবিধা পাবে বলে আসা করা হচ্ছে।
